বিদ্যালয় আছে, শিক্ষার্থী আছে, শিক্ষকও আছেন। কিন্তু নেই বিদ্যালয়ের প্রধান। বরিশাল বিভাগের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর বড় একটি অংশে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। বিভাগের ৬ হাজার ২৪৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২ হাজার ৫৯৯টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক। অর্থাৎ প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় চারটিই চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহকারী শিক্ষক সংকট। বিভাগের ছয় জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত ৩৩ হাজার ১২৩টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩০ হাজার ৯৪ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ২৯টি পদ।

বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষার উপপরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ বরিশাল জেলায়। জেলার ১ হাজার ৫৮৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৩৩টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ জেলার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।

বরিশাল বিভাগের অন্য জেলাগুলোর চিত্রও উদ্বেগজনক। পটুয়াখালীর ১ হাজার ২৩৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৯১টি, পিরোজপুরের ৯৮৯টির মধ্যে ৩৪০টি, ভোলার ১ হাজার ৪৭টির মধ্যে ৪২৮টি, বরগুনার ৭৯৯টির মধ্যে ৩০৬টি এবং ঝালকাঠির ৫৮৫টির মধ্যে ২০৯টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই।

উপজেলা পর্যায়েও সংকটের চিত্র স্পষ্ট। আগৈলঝাড়ার ৯৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০টিতে, উজিরপুরের ১৮১টির মধ্যে ১১১টিতে এবং গৌরনদীর ১৩১টির মধ্যে ৯০টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। এছাড়া বরিশাল সদরের ২০১টির মধ্যে ৭২টি, বাকেরগঞ্জের ২৭৯টির মধ্যে ১৮১টি, বানারীপাড়ার ১২৬টির মধ্যে ৮৭টি, বাবুগঞ্জের ১৩৪টির মধ্যে ৭৬টি, মুলাদীর ১৩৯টির মধ্যে ৯০টি, মেহেন্দীগঞ্জের ২০৮টির মধ্যে ১১৩টি এবং হিজলার ৯২টির মধ্যে ৫৩টি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া।

তবে শূন্য পদ থাকলেও সব বিদ্যালয় পুরোপুরি প্রধান শিক্ষকবিহীন নয়। বিভাগের ৩ হাজার ৬৪৪টি বিদ্যালয়ে শিক্ষকরা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে ১ হাজার ১৪ জন চলতি দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে স্থায়ী নিয়োগ বা পদোন্নতির বদলে অস্থায়ী ব্যবস্থায় অনেক বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব সামলানো হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রমেরও গুরুত্বপূর্ণ তদারককারী। শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসছেন কি না, শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কেমন এবং বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা—এসব বিষয় দেখভালে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দীর্ঘদিন পদটি শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সহকারী শিক্ষক সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। শূন্য ৩ হাজার ২৯টি পদের মধ্যে বরিশালে ৬২৯টি, পটুয়াখালীতে ৭৭৫টি, পিরোজপুরে ৪৯৬টি, ভোলায় ৪৬৪টি, বরগুনায় ৩৮০টি এবং ঝালকাঠিতে ২৮৫টি পদ রয়েছে।

কোথাও প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও সহকারী শিক্ষক কম—আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে দুই ধরনের সংকটই রয়েছে। এতে কর্মরত শিক্ষকদের ওপর বাড়ছে অতিরিক্ত কাজের চাপ। ফলে নিয়মিত পাঠদান, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের আলাদা নজর দেওয়ার মতো কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহিন বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ীভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। এর মধ্যে অনেকে অবসর নিয়েছেন, আবার অনেকে মারা গেছেন। কিন্তু শূন্য পদ পূরণে নতুন করে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ করা প্রয়োজন।

বিদ্যালয়ের বাইরেও প্রাথমিক শিক্ষার তদারকি ব্যবস্থায় জনবল সংকট রয়েছে। বিভাগের ছয় জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ৭০টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৯ জন। শূন্য রয়েছে ৩১টি পদ। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসগুলোতে ৫৩৯টি পদের বিপরীতে কর্মরত ২২৬ জন। শূন্য রয়েছে ৩১৩টি পদ। এছাড়া বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয়ে ১৪টি পদের মধ্যে পাঁচটি শূন্য।

সচেতন মহলের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের তদারকির দায়িত্বে থাকা দপ্তরগুলোতেই যদি বড় সংখ্যক পদ শূন্য থাকে, তাহলে বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষকদের জবাবদিহি ও শিক্ষার মান পর্যবেক্ষণ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সুজন বরিশাল জেলার সাধারণ সম্পাদক রনজিৎ দত্ত বলেন, এটিকে শুধু শূন্য পদের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে একটি প্রজন্মের শিক্ষার ওপর। দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি শিক্ষা অফিসের শূন্য পদ পূরণ, নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

বরিশাল বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মীর জাহিদুল কবির তুহিন বলেন, পুরো বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।