রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা ও সততাকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।

জুবায়ের বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের সময় দলীয় পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তির যোগ্যতা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দলীয় পরিচয় যেন কোনো যোগ্য ব্যক্তির কাজ করার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি না করে, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব ও পেশাগত গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি সংবাদ ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে, আবার ভুল বা দায়িত্বহীন তথ্য ক্ষতির কারণও হতে পারে। এ কারণে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীলতা ও পেশাগত সততার সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন।

বিশেষ করে অপরাধ ও আইনবিষয়ক সাংবাদিকতায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন জামায়াতের এই নেতা। তার মতে, আইন ও অপরাধের পরিবর্তিত ধরন সম্পর্কে হালনাগাদ জ্ঞান না থাকলে যথাযথভাবে সংবাদ পরিবেশন করা কঠিন।

দেশের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন, নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির সমন্বিত ও দায়িত্বশীল ভূমিকার ওপরও গুরুত্ব দেন জুবায়ের।

জুলাই আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আন্দোলনে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। আহত শিশুদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিয়েও কথা বলেন জামায়াতের এই নেতা। তার ভাষ্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ঐকমত্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো একক রাজনৈতিক দলের প্রভাব এড়িয়ে চলার ওপর গুরুত্ব দেন জুবায়ের। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে ধারাবাহিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা বজায় রাখাও মানুষের আস্থা তৈরির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সংসদে সংস্কারসংক্রান্ত বিষয়গুলোর সমাধান প্রত্যাশা করেন উল্লেখ করে জুবায়ের বলেন, রাজনৈতিক দাবিগুলো নিয়ে তাদের জোট শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে যাবে।

দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিয়েও কথা বলেন তিনি। এসব সমস্যা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে কার্যকর উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান জুবায়ের।

ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয়করণের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকা কোনো দলেরই সব প্রতিষ্ঠান নিজেদের লোকজন দিয়ে পরিচালনার চেষ্টা করা উচিত নয়। বরং যোগ্য, দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় কাজে সম্পৃক্ত করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি গবেষক ও উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর কথাও বলেন জুবায়ের। বিদেশি পরামর্শকের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি পিএইচডি ও পোস্টডক্টরেটধারীদের দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষা, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্য তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে এসব নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন না এনে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পক্ষে মত দেন জুবায়ের।

সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল ও নেতাদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার দায়িত্ব সাংবাদিকদের রয়েছে এবং সেই সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা উচিত।

অনুষ্ঠানে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদও বক্তব্য দেন। ক্রাইম রিপোর্টাররা দুর্নীতি ও অপরাধের তথ্য প্রকাশ করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েন উল্লেখ করে তাদের পেশাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, বড় দুর্নীতিবাজ ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান ও প্রকাশ করতে গিয়ে ক্রাইম রিপোর্টারদের ঝুঁকি নিতে হয়। এ কারণে তাদের নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।

ক্রাইম রিপোর্টিং শক্তিশালী হলে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতার পরিবেশও শক্তিশালী হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ক্র্যাবের ৪৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কার্যনির্বাহী কমিটি ও সদস্যদের শুভেচ্ছা জানান দুই নেতা।