পৃথিবীর প্রাণ ও প্রকৃতিকে সূর্যের ক্ষতিকর অতিবেগুনি রশ্মি থেকে রক্ষা করা ওজোনস্তর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিকভাবে ওজোন-ক্ষয়কারী রাসায়নিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে মন্ট্রিল প্রটোকলের সফল বাস্তবায়নই এই অগ্রগতির প্রধান কারণ বলে জানিয়েছে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও)।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব ওজোন দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত ডব্লিউএমওর নতুন ‘ওজোন অ্যান্ড ইউভি বুলেটিন’-এ বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অ্যান্টার্কটিকার ওজোন গহ্বর গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ছোটগুলোর একটি ছিল।

১৯৯২ সাল থেকে তীব্র ওজোন ক্ষয়ের যে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেই সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালের ওজোন গহ্বরটি চতুর্থ বা পঞ্চম ক্ষুদ্রতম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এর গভীরতা ও বিস্তার ১৯৯০-২০১০ সময়ের গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল।

তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো একটি বছরের ওজোন গহ্বর ছোট হলেই পুরো সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে, এমন ভাবার সুযোগ নেই। আবহাওয়ার বড় ধরনের পরিবর্তন বছরভেদে ওজোন গহ্বরের আকার ও গভীরতায় প্রভাব ফেলে। তবে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, সামগ্রিকভাবে ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারের পথে রয়েছে।

ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো এই অগ্রগতিকে বড় ধরনের পরিবেশগত সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২০০০ সাল থেকে ওজোনস্তরের পুনরুদ্ধারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বর্তমান নীতি ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে অ্যান্টার্কটিকা ও আর্কটিকের বাইরের বিশ্বের বেশির ভাগ অঞ্চলের ওজোনস্তর আনুমানিক ২০৪০ সালের মধ্যে ১৯৮০ সালের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে। আর্কটিক অঞ্চলে এ জন্য প্রায় ২০৪৫ সাল এবং অ্যান্টার্কটিকায় প্রায় ২০৬৬ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

ওজোনস্তর মূলত পৃথিবীর স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারে অবস্থান করে। বায়ুমণ্ডলের মোট ওজোনের প্রায় ৯০ শতাংশই এই স্তরে রয়েছে। ডব্লিউএমও বলছে, বায়ুমণ্ডলের সব ওজোনকে যদি পৃথিবীর পৃষ্ঠে এনে একটি স্তর তৈরি করা যেত, তার পুরুত্ব হতো মাত্র প্রায় ৩ মিলিমিটার। অথচ এই পাতলা আবরণই সূর্যের ক্ষতিকর স্বল্প-তরঙ্গের অতিবেগুনি রশ্মির প্রায় পুরোটাই আটকে পৃথিবীর জীবজগতকে সুরক্ষা দেয়।

ওজোনস্তরের ক্ষয় হলে মানুষের অতিবেগুনি রশ্মির সংস্পর্শ বাড়ে। এতে ত্বকের ক্যানসারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। ডব্লিউএমও জানিয়েছে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ইউরোপের কিছু অঞ্চলে অতিবেগুনি বিকিরণ প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। তবে এর পেছনে ওজোনের পাশাপাশি মেঘের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং সূর্যালোকের সময় বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

ওজোনস্তর রক্ষার আন্তর্জাতিক উদ্যোগ শুরু হয় ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর মন্ট্রিল প্রটোকল স্বাক্ষরের মাধ্যমে। চুক্তির আওতায় সিএফসিসহ ওজোন ধ্বংসকারী বিভিন্ন রাসায়নিকের উৎপাদন ও ব্যবহার ধাপে ধাপে বন্ধ বা কমিয়ে আনা হয়।

এই ঐতিহাসিক চুক্তির স্মরণে জাতিসংঘ ১৯৯৪ সালে ১৬ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক ওজোনস্তর সুরক্ষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

২০২৬ সালের বিশ্ব ওজোন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘Global Action for a Cooler Planet’ বা ‘পৃথিবীকে শীতল রাখতে বৈশ্বিক উদ্যোগ’। এ বছর মন্ট্রিল প্রটোকলের কিগালি সংশোধনীর দশ বছরও পূর্ণ হচ্ছে।

২০১৬ সালের কিগালি সংশোধনীর মাধ্যমে হাইড্রোফ্লোরোকার্বন বা এইচএফসির ব্যবহার ধাপে ধাপে কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এইচএফসি ওজোনস্তর ক্ষয়ের প্রধান কারণ নয়, তবে এগুলোর অনেকগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। জাতিসংঘের হিসাবে কিগালি সংশোধনী পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে শতাব্দীর শেষ নাগাদ বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রায় শূন্য দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম রাখতে সহায়তা করতে পারে।

তবে ওজোনস্তর পুনরুদ্ধারের পথে এখনো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

গত চার দশকে নিয়ন্ত্রিত ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও কিছু অপ্রত্যাশিত নির্গমন শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সিএফসি-১১-এর অস্বাভাবিক নির্গমন বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ তৈরি করেছিল। একইভাবে শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস এইচএফসি-২৩-এর অপ্রত্যাশিত নির্গমনও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

নতুন একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় আরও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। শিল্পকারখানায় অন্যান্য রাসায়নিক তৈরির কাঁচামাল বা ‘ফিডস্টক’ হিসেবে ব্যবহৃত ওজোন-ক্ষয়কারী পদার্থের একটি অংশ বায়ুমণ্ডলে চলে যাচ্ছে। বর্তমান হারে এই নির্গমন অব্যাহত থাকলে মধ্য অক্ষাংশে ওজোনস্তরের পুনরুদ্ধার গড়ে প্রায় সাত বছর পিছিয়ে যেতে পারে। গবেষণায় সম্ভাব্য বিলম্বের সীমা ছয় থেকে ১১ বছর বলে হিসাব করা হয়েছে।

বিজ্ঞানীরা তাই ওজোনস্তরের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।

ডব্লিউএমওর তথ্য অনুযায়ী, ওজোন পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত ডবসন ও ব্রুওয়ার স্পেকট্রোফটোমিটার স্টেশনের সংখ্যা ২০০০ সালের শুরুর দিকে প্রায় ১৩০টি ছিল। বর্তমানে তা কমে প্রায় ১১০টিতে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আগে থেকেই দুর্বল, সেখানকার কিছু স্টেশন বন্ধ হয়ে যাওয়াকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নতুন প্রযুক্তির পর্যবেক্ষণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়লেও সেগুলোর অনেকগুলো মূলত বায়ুদূষণ পরিমাপের জন্য তৈরি, স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন পর্যবেক্ষণের জন্য নয়।

বিজ্ঞানীদের মতে, মন্ট্রিল প্রটোকল দেখিয়েছে, বৈশ্বিক পরিবেশগত সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারি কার্যকর ফল দিতে পারে। ওজোনস্তর এখন পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও সেই অর্জন ধরে রাখতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত নির্গমন বন্ধ এবং বৈশ্বিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।