সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করার সময় অনেক দম্পতির মনেই অনাগত শিশুর সুস্থতা নিয়ে নানা উদ্বেগ তৈরি হয়। এর মধ্যে জন্মগত ত্রুটি অন্যতম। জন্মগত ত্রুটি বা কনজেনিটাল ডিজঅর্ডার বলতে গর্ভাবস্থায় তৈরি হওয়া এমন গঠনগত বা কার্যগত সমস্যা বোঝায়, যা জন্মের আগে, জন্মের সময় অথবা কখনো পরে শনাক্ত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বজুড়ে আনুমানিক ৬ শতাংশ শিশু কোনো না কোনো জন্মগত সমস্যা নিয়ে জন্মায়। তবে সব জন্মগত ত্রুটির কারণ জানা সম্ভব হয় না। জিনগত কারণ, মাতৃস্বাস্থ্য, সংক্রমণ, পুষ্টির ঘাটতি এবং কিছু পরিবেশগত ঝুঁকি এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

বাংলাদেশে ২০২৩ সালে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ৭.০২ শতাংশ নবজাতকের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জন্মগত ত্রুটি পাওয়া যায়। তবে এটি জাতীয় পর্যায়ের হার নয়। ২০১৪ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ওই হাসপাতালের নবজাতক বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া ১১ হাজার ২৩২ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে এ ফল পাওয়া হয়েছিল।

জন্মগত ত্রুটি খুব সামান্য থেকে গুরুতর পর্যন্ত হতে পারে। বাড়তি আঙুল বা অতিরিক্ত স্তনবৃন্তের মতো কিছু ত্রুটি শিশুর স্বাভাবিক জীবনে বড় বাধা তৈরি নাও করতে পারে। আবার জন্মগত হৃদরোগ, স্পাইনা বাইফিডা, ঠোঁট বা তালু কাটা এবং কিছু জটিল অঙ্গগত সমস্যা চিকিৎসার প্রয়োজন তৈরি করতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গুরুতর জন্মগত সমস্যাগুলোর মধ্যে হৃদযন্ত্রের ত্রুটি, নিউরাল টিউব ডিফেক্ট এবং ডাউন সিনড্রোম উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক কারণ শনাক্ত করা যায় না।

জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকির সঙ্গে বংশগত ও ক্রোমোজোমজনিত কিছু কারণের সম্পর্ক রয়েছে। নিকট রক্তসম্পর্কের মধ্যে বিয়েতে কিছু বিরল জিনগত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। মায়ের বয়স বেশি হলে ডাউন সিনড্রোমসহ কিছু ক্রোমোজোমজনিত সমস্যার ঝুঁকিও বাড়ে।

গর্ভাবস্থায় অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রুবেলাসহ কিছু সংক্রমণ, ধূমপান, অ্যালকোহল ও নির্দিষ্ট কিছু ওষুধও জন্মগত সমস্যার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত। তবে কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করাও নিরাপদ নয়। গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলে নিয়মিত ব্যবহৃত সব ওষুধের বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা প্রয়োজন।

জন্মগত হৃদরোগের ক্ষেত্রে শিশুর দ্রুত শ্বাস নেওয়া, খাওয়ার সময় ক্লান্ত হয়ে পড়া, অতিরিক্ত ঘাম, ওজন না বাড়া কিংবা কিছু ক্ষেত্রে ঠোঁট বা ত্বক নীলচে হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ থাকলে দ্রুত শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বা শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

অনেক জন্মগত ত্রুটির চিকিৎসা সম্ভব। ঠোঁট ও তালু কাটা, কিছু জন্মগত হৃদরোগ, ক্লাবফুটসহ বেশ কিছু সমস্যার ক্ষেত্রে সময়মতো অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব। চিকিৎসার ধরন ও সময় শিশুর অবস্থা অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নির্ধারণ করেন।

ঝুঁকি কমাতে গর্ভধারণের আগের প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকেই ডায়াবেটিস, থাইরয়েড বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ব্যবহৃত ওষুধগুলো গর্ভাবস্থায় নিরাপদ কি না, চিকিৎসকের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

ফলিক অ্যাসিডও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বলছে, যাঁরা গর্ভধারণ করতে পারেন তাঁদের প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করা উচিত। গর্ভধারণের অন্তত এক মাস আগে থেকে এবং গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ করলে শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের গুরুতর নিউরাল টিউব ডিফেক্টের ঝুঁকি কমানো যায়। বিশেষ ঝুঁকি থাকলে ডোজ ভিন্ন হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

গর্ভাবস্থায় ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপান, অ্যালকোহল ও অন্যান্য ক্ষতিকর মাদক এড়িয়ে চলা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। রুবেলার মতো কিছু সংক্রমণ গর্ভস্থ শিশুর ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।

গর্ভস্থ শিশুর কিছু গঠনগত সমস্যা আগে থেকেই শনাক্ত করার জন্য সাধারণত ১৮ থেকে ২১ সপ্তাহের মধ্যে বিস্তারিত আলট্রাসনোগ্রাম বা অ্যানোম্যালি স্ক্যান করা হয়। এতে শিশুর মস্তিষ্ক, মেরুদণ্ড, হৃদযন্ত্র, মুখমণ্ডল, কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গের গঠন দেখা হয়। তবে এই পরীক্ষায় সব ধরনের জন্মগত সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

পরিবারে নির্দিষ্ট জিনগত রোগের ইতিহাস, আগের সন্তানের জন্মগত সমস্যা অথবা স্ক্রিনিং পরীক্ষায় সন্দেহ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে আরও কিছু পরীক্ষা করা হতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রোমোজোম বা জিনগত পরীক্ষা, অ্যামনিওসেনটেসিস বা কোরিওনিক ভিলাস স্যাম্পলিংয়ের মতো পরীক্ষা বিবেচনা করা হয়।

গর্ভাবস্থায় এক্স-রে বা সিটি স্ক্যান নিয়ে একটি প্রচলিত ভুল ধারণাও রয়েছে। এসব পরীক্ষা সব অবস্থায় নিষিদ্ধ নয়। আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস বলছে, প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক এক্স-রে বা সিটি স্ক্যানের বিকিরণের মাত্রা সাধারণত ভ্রূণের ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত মাত্রার অনেক নিচে থাকে। চিকিৎসার জন্য পরীক্ষা জরুরি হলে শুধু গর্ভাবস্থার কারণে তা বাদ দেওয়া উচিত নয়। তবে চিকিৎসক ও রেডিওলজিস্টকে অবশ্যই গর্ভাবস্থার কথা জানাতে হবে, যাতে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি বেছে নেওয়া যায়।

সব জন্মগত ত্রুটি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিত গর্ভধারণ, গর্ভধারণের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিকর পদার্থ এড়িয়ে চলা এবং নিয়মিত প্রসবপূর্ব চিকিৎসা কিছু গুরুতর জন্মগত সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা